গুয়াহাটির শরণিয়া পাহাড়ের ওপর কস্তুরবা আশ্রমের নাম তোমরা অনেকেই হয়তো শুনেছ। আজ আমরা পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের পাঠ ১১ অমলপ্রভা দাস পাঠটি নিয়ে কথা বলব। তাঁর হাত ধরে এই কস্তুরবা আশ্রমের কাজের সূচনা হয়েছিল।
পাঠ ১১ অমলপ্রভা দাস: মূল কথা
নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভুলে দেশের মানুষের কল্যাণে যাঁরা সারাজীবন কাজ করে গেছেন, অসমের প্রখ্যাত সমাজসেবিকা অমলপ্রভা দাস তাঁদেরই একজন। ধনী অথচ অত্যন্ত সরল ও আদর্শবান এক পরিবারে তিনি বড়ো হয়েছিলেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি বাগান করা, সংসারের কাজ এবং নাচ-গানেও তাঁর দারুণ আগ্রহ ছিল। মেয়ে হওয়ার কারণে গুয়াহাটির কটন মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলেও তিনি সেখানে থামেননি। কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে পড়াশোনা করে তিনি প্রথম অসমিয়া মহিলা হিসেবে ব্যবহারিক রসায়ন বিদ্যায় এম. এস. সি. পাশ করেন।
মাত্র ১০ বছর বয়সে মহাত্মা গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে তিনি চরকায় সুতা কাটা শুরু করেন। পরবর্তীতে গুয়াহাটির শরণিয়া পাহাড়ে বাবার জমিতে তেল উৎপাদনের জন্য ঘানি, সাবান ও কাগজ তৈরি এবং কাপড় বোনার তাঁত বসিয়ে গ্রামের যুবক-যুবতীদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখান।
আচার্য বিনোবা ভাবের ভূ-দান ও শ্রমদান আন্দোলনেও তিনি গোটা অসম ঘুরেছিলেন। ভারত সরকার তাঁকে 'পদ্মবিভূষণ' সম্মান দিতে চাইলে, মনে অহংকার আসতে পারে ভেবে তিনি সেটি সবিনয়ে ফিরিয়ে দেন।
পাঠ ১১ অমলপ্রভা দাস প্রশ্ন উত্তর ও অনুশীলনীর সমাধান
ক – পাঠভিত্তিক প্রশ্ন উত্তর
২। কে, কাকে, কেন বলেছিলেন, বলো ও লেখো।
"আমি সামান্যভাবে যে-টুকু দেশসেবা করতে পেরেছি, তাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। কিন্তু আমি এই সম্মান গ্রহণ করতে অসমর্থ, কারণ এ-টি আমার মনে অহংকার ভাব এনে দেবে। এ জন্য অনুগ্রহ করে আমাকে মার্জনা করবেন।”
উত্তর: উদ্ধৃত কথাগুলো সমাজসেবিকা অমলপ্রভা দাস ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছিলেন।
১৯৫৫ সালে ভারত সরকার অমলপ্রভা দাসকে সমাজসেবামূলক কাজের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান 'পদ্মবিভূষণ' দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তিনি ভেবেছিলেন এই পুরস্কার নিলে তাঁর মনে হয়তো অহংকার জন্মাতে পারে। তাই সেই সম্মান গ্রহণ করতে না চেয়ে তিনি চিঠিতে এই কথাগুলো লিখেছিলেন।
৩। স্কুল জীবনে অমলপ্রভা দাস পড়াশোনা করা ছাড়াও মা-বাবাকে কী কী কাজে সাহায্য করতেন? উত্তর: অমলপ্রভা দাস পড়াশোনা করা ছাড়াও মা-বাবাকে সংসারের নানা কাজ-কর্মে সাহায্য করতেন। এছাড়া বাগানে ফুলের চারা লাগানো এবং গাছে নিয়মিত জল দেওয়ার কাজও তিনি খুব আনন্দের সাথে করতেন।
৪। কটন মহাবিদ্যালয়ে তাঁকে পড়তে দেওয়া হয়নি কেন? উত্তর: সেই সময়ে কটন মহাবিদ্যালয়ে ছাত্র ও ছাত্রীদের একসাথে পড়ার কোনো নিয়ম ছিল না। কলেজে শুধুমাত্র ছেলেরাই পড়ার সুযোগ পেত। তাই মেয়ে হওয়ার কারণে তাঁকে সেখানে ভর্তি হতে দেওয়া হয়নি।
৫। তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কেন পরিত্যাগ করেছিলেন? উত্তর: ১৯৪১ সালে স্বরাজ আন্দোলনের সময় গ্রামে গ্রামে প্রচারে গিয়ে অমলপ্রভা দাস গ্রামীণ মানুষের চরম অভাব ও দারিদ্র্য নিজের চোখে দেখতে পান। দেশের এই গরিব মানুষদের দুঃখ দূর করার তাগিদেই তিনি চিরকাল অবিবাহিত থাকেন। এছাড়াও, কোনো সরকারি চাকরি না নিয়ে নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেন।
খ – ভাষা-অধ্যয়ন (ব্যবহারিক ব্যাকরণ)
- ঘ্ন — বিঘ্ন (বাধা-বিঘ্ন)
- স্ব — সর্বস্ব, স্বাধীনতা, স্বরাজ
- দ্ম — পদ্মবিভূষণ
- স্ম — স্মরণীয়
- প্ল — বিপ্লবী
- ম্ব — স্বাবলম্বী
- ম্ম — সম্মানিত
- স্থ — উপস্থিত, অবস্থাপন্ন
- কমল (পদ্মফুল): শরৎকালে বিলের জলে অনেক কমল ফুটে থাকে।
কোমল (নরম): ছোটো শিশুটির হাত দুটি কী কোমল! - বিনা (ছাড়া): কঠোর পরিশ্রম বিনা পরীক্ষায় ভালো ফল করা যায় না।
বীণা (বাদ্যযন্ত্র): সরস্বতী পূজার মণ্ডপে দেবীর হাতে সুন্দর বীণা দেখা যায়। - শোনা (শ্রবণ করা): চা বাগানের গাছের আড়াল থেকে শালিক পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
সোনা (মূল্যবান ধাতু): প্রাচীনকালে অসমের সোবমশিরি নদীর বালিতে সোনা পাওয়া যেত। - বিশ (সংখ্যা): আমাদের স্কুলের বাগানে বিশটি নতুন ফুলের চারা লাগানো হয়েছে।
বিষ (গরল): গোখরো সাপের দাঁতে মারাত্মক বিষ থাকে। - ধনি (শব্দ বা আওয়াজ): বিহুর ঢোলের ধনি শুনলেই মন আনন্দে নেচে ওঠে।
ধনী (বিত্তবান): অমলপ্রভা দাসের পরিবার ধনী হলেও তাঁরা খুব সাধারণভাবে থাকতেন। - শাপ (অভিশাপ): পুরাণের গল্পে মুনি-ঋষিরা রেগে গিয়ে রাজাকে শাপ দিতেন।
সাপ (সর্প): বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্রের জলে চারপাশ ডুবে গেলে মাঝে মাঝে সাপ দেখা যায়। - দিন (দিবস): শীতকালের দিনগুলো বেশ ছোটো হয়।
দীন (দরিদ্র): অমলপ্রভা দাস সারা জীবন দীন-দুঃখী মানুষের সেবা করে গেছেন। - যজ্ঞ (আহুতি বা পূজা): মন্দিরে পুরোহিত মশাই সকাল থেকে যজ্ঞ করছেন।
যোগ্য (উপযুক্ত): রবিন তার কাজের মাধ্যমে নিজেকে দলের যোগ্য নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছে।
৬। নীচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং উদাহরণের মতো বাক্সে বিশেষ্য, বিশেষণ ও সর্বনাম পদগুলো খুঁজে বের করে খাতায় লেখো।
উত্তর: পাঠ্যবইয়ের দেওয়া অনুচ্ছেদটি থেকে খুঁজে পাওয়া পদগুলো হলো—
বিশেষ্য পদ: পিতা-মাতা, পরিবার, দেশপ্রেম, পরিবেশ, অমলপ্রভা, পড়াশোনা, আগ্রহ, বই-পত্র, বিদ্যালয়, বাড়ি, বাগান, ফুলগাছ, গাছ, জল, নাচ-গান।
বিশেষণ পদ: অবস্থাপন্ন, অনাড়ম্বর, সরল, অদম্য, মেধাবী, ব্যস্ত, সমান, দক্ষ।
সর্বনাম পদ: তাঁর, তাঁদের, সেই, তিনি।
৭। এসো, ভাব-সম্প্রসারণ করি: সোনা যতই পোড়ে, উজ্জ্বলতা তার ততই বাড়ে। উত্তর: খনি থেকে তোলা সোনায় প্রথমে নানা রকম খাদ বা ময়লা মেশানো থাকে। স্বর্ণকার যখন সেই সোনাকে আগুনে পোড়ান, তখন আগুনের তাপে ময়লাগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। এরফলে খাঁটি সোনা আরও ঝকঝকে হয়ে ওঠে।
মানুষের জীবনও অনেকটা এই সোনার মতোই। কাজ করতে গেলে জীবনে নানা রকম বাধা-বিঘ্ন ও কঠিন পরিস্থিতি আসে। কিন্তু যাঁরা নিজেদের লক্ষ্যে স্থির থাকেন, তাঁরা সেই বাধার কাছে কখনো হার মানেন না। তাঁরা ভেতর থেকে আরো খাঁটি, অভিজ্ঞ এবং মহান হয়ে ওঠেন।তাই জীবনের দুঃখ-কষ্ট বা বিপদে আমাদের ভেঙে পড়া উচিত নয়।
গ – জ্ঞান-সম্প্রসারণ
২। অমলপ্রভা দাস ও চন্দ্রপ্রভা শইকিয়ানির মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে মিল এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অমিল লক্ষ করেছ, বলো ও লেখো।
উত্তর: অসমের এই দুই মহীয়সী নারীর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল এক। তাঁরা দুজনেই ছোটোবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সাধারণ মানুষের সেবা ও সমাজের উন্নতির জন্য তাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
তবে তাঁদের বেড়ে ওঠা এবং কাজের ধরনে কিছু অমিল ছিল। অমলপ্রভা দাসের জন্ম হয়েছিল শহরে এক সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারে, এবং তিনি রসায়ন বিদ্যায় এম. এস. সি. পাশ করেছিলেন। তিনি মূলত কুটির শিল্প ও গ্রামোন্নয়নের মাধ্যমে মানুষকে স্বাবলম্বী করার কাজ করেছেন।
অন্যদিকে, চন্দ্রপ্রভা শইকিয়ানি জন্মেছিলেন এক পিছিয়ে পড়া গ্রামে। যেখানে মেয়েদের পড়ার জন্য কোনো পাঠশালাও ছিল না। তিনি অনেক লড়াই করে বৃত্তির সাহায্যে পড়াশোনা করেছেন, পেশায় শিক্ষিকা হয়েছেন। এছাড়াও মহিলা সমিতি গড়ে নারীশিক্ষা বিস্তারে ও সাহিত্যচর্চায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।
৩। গান্ধিজি চরকায় সুতা কাটতেন। চরকা ছাড়াও আর কীভাবে সুতা কাটা যায়? উত্তর: চরকা ছাড়াও হাতে ঘোরানো ছোটো যন্ত্র 'তকলি' বা 'টেকো'-র সাহায্যে তুলো থেকে সুতা কাটা যায়। এছাড়া বর্তমান যুগে আধুনিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সাহায্যে খুব কম সময়ে প্রচুর সুতা তৈরি করা হয়।
৪। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'পরশমণি' কবিতাটি সবাই মিলে আবৃত্তি করো। উত্তর: পাঠ্যবইয়ে দেওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতাটি তোমরা ক্লাসে শিক্ষকের সাহায্য নিয়ে সবাই মিলে সুর করে গাইবে ও আবৃত্তি করবে।
ঘ – প্রকল্পের কাজ
আমাদের রাজ্য অসমে নাচ, গান, সাহিত্য থেকে শুরু করে খেলাধুলা—সব ক্ষেত্রেই মেয়েরা দারুণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের নাম নিচে দেওয়া হলো:
- নৃত্য: পুষ্পা ভূঞা, গরিমা হাজারিকা, শারদী শইকিয়া
- গীত: প্রতিমা বরুয়া পাণ্ডে, দীপালি বরঠাকুর, তরাপ্রভা দেবী
- বাদ্য: মিনতি খউন্দ (বেহালা), সবিতা দেবী
- খেলা: হিমা দাস (দৌড়), লাভলিনা বরগোঁহাই (বক্সিং)
- কবিতা রচনা: নলিনীবালা দেবী, নির্মলপ্রভা বরদলৈ
- গল্প লেখা: মামণি রয়সম গোস্বামী, নিরূপমা বরগোহাঞি
- সাঁতার: আস্থা চৌধুরী, শিবানী কটকী
| বিশেষ্য | বিশেষণ | সর্বনাম |
|---|---|---|
| অমলপ্রভা | দৃঢ়চেতা | তিনি |
| চরকা | স্পষ্টবাদী | তাঁকে |
| গুয়াহাটি | আদর্শবান | তাঁদের |
| কস্তুরবা আশ্রম | স্বাবলম্বী | তাঁর |
| জওহরলাল নেহেরু | দরিদ্র | আমি |
পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী পাঠ:
আগের পাঠ: পাঠ ১০ তিনটি মাছের কাহিনি প্রশ্নোত্তর
পরের পাঠ: পাঠ ১২ চরণে প্রণাম প্রশ্নোত্তর
গুয়াহাটির শরণিয়া পাহাড়ে গেলে আজও অমলপ্রভা দাসের গড়ে তোলা কস্তুরবা আশ্রমের শান্ত পরিবেশটি চোখে পড়ে। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ১১ নম্বর 'অমলপ্রভা দাস' পাঠটি এখানেই শেষ করলাম।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন