গ্রামের মেঠো পথ বা পুকুরপাড়ে তাকালেই দেখা যায় সব গাছকে ছাড়িয়ে লম্বা তালগাছ এক পায়ে সোজা হয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। চতুর্থ শ্রেণির Bangla বইয়ের প্রথম অধ্যায় আমাদের চারপাশ-এর পাঠ ১-এ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বিখ্যাত 'তালগাছ' কবিতাটি দেওয়া হয়েছে। এই পাঠের প্রশ্ন উত্তর গুলো আজকের আর্টিকালের মধ্যে দেওয়া হল।
পাঠ ১ তালগাছ কবিতার মূলভাব
'শিশু ভোলানাথ' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া এই কবিতায় কবি তালগাছের মনের এক গোপন ইচ্ছার কথা কল্পনা করেছেন। অন্য সব গাছের চেয়ে উঁচু হওয়ায় তালগাছটি প্রতিদিন আকাশে উঁকি মারে। তার মনে খুব শখ জাগে যে সে কালো মেঘ ফুঁড়ে পাখির মতো ডানা মেলে আকাশে উড়ে যাবে।
গাছের তো আর পাখির মতো সত্যিকারের ডানা নেই। তাই নিজের মাথার ওপর থাকা গোল গোল পাতাগুলোকেই সে ডানা বলে ভাবতে শুরু করে।
সারাদিন ধরে যখন বাতাস বয়, তখন তার পাতাগুলো ঝরঝর ও থত্থর করে কাঁপতে থাকে। সেই পাতার কাঁপন দেখে মনে হয় তালগাছটি বুঝি নিজের বাসা ছেড়ে তারাদের পাশ কাটিয়ে দূর আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু বাতাস থেমে গেলেই তার পাতা কাঁপা বন্ধ হয়ে যায়। গাছটির মন আবার মাটিতে ফিরে আসে। সে তখন বুঝতে পারে যে এই মাটিই হলো তার আসল মা। তাই পৃথিবীর এই ছোটো কোণটিই তার কাছে আবার খুব ভালো লাগতে শুরু করে।
চতুর্থ শ্রেণি বাংলা পাঠ ১ তালগাছ প্রশ্ন উত্তর
১। নীচের উক্তিগুলো শুদ্ধ না অশুদ্ধ বিচার করো
- তালগাছটি দুই পায়ে দাঁড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে: অশুদ্ধ (✗)
- কালো মেঘ ফুঁড়ে তালগাছটি উড়ে যেতে চাইছে আকাশে — শুদ্ধ (✓)
- তালগাছটি তার পাতাগুলিকে ডানা বলে মনে করেছে - শুদ্ধ (✓)
- পাতা ঝরঝর থত্থর করে কাঁপে | শুদ্ধ (✓)
- হাওয়া থেমে গেলেও পাতা কাঁপা থামে না: অশুদ্ধ (✗)
২ ও ৩। পাঠভিত্তিক সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
(ক) তাল গাছ থেকে আমরা কী কী পাই? উত্তর: তাল গাছ থেকে আমরা তাল ফল, তালের রস ও কাঠ পাই। তালপাতা দিয়ে হাতপাখা, মাদুর ও ঘরের ছাউনি তৈরি করা হয়। এই গাছের শক্ত কাণ্ড ঘরবাড়ি বানানোর কাজেও লাগে।
(খ) পৃথিবীর সমস্ত গাছ যদি উড়ে বেড়াতে পারত তাহলে কী হতো? উত্তর: পৃথিবীর সব গাছ যদি পাখির মতো উড়ে চলে যেত, তবে চারপাশের প্রকৃতি একদম ফাঁকা ও ছায়াহীন হয়ে পড়ত। পশু-পাখিরা তাদের বাসা হারাত এবং আমরা ফলমূল, ফুল ও কাঠ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতাম। চারিদিকে অনেক অসুবিধা সৃষ্টি হতো।
(গ) যদি তুমি সেই উড়ন্ত গাছের সঙ্গী হওয়ার সুযোগ পাও তাহলে কোন্ গাছটিকে তুমি বেছে নেবে এবং কেন? উত্তর: আমি আমগাছকে বেছে নেব। কারণ আমগাছে সুস্বাদু ফল হয় এবং গাছটি ছায়া দেয়। উড়ন্ত আমগাছে চড়ে আকাশে ঘুরতে খুব ভালো লাগবে।
৪। নীচের শব্দগুলি দিয়ে একটি করে বাক্য রচনা করো
- পাতা: শুকনো তালপাতা দিয়ে খুব সুন্দর হাতপাখা তৈরি করা হয়।
- হাওয়া — বিকেলবেলা নদীর ধারে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
- পৃথিবী - গাছপালা, নদী ও পাহাড় নিয়ে আমাদের এই পৃথিবী ভীষণ সুন্দর।
- মেঘ - বর্ষাকালে আকাশে কালো মেঘ জমলেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে।
৫। ছবি দেখে পঙক্তির শূন্যস্থান পূর্ণ করো এবং নতুন দুটি পঙক্তি লেখো
উফ কী যে গরম
যাচ্ছে না থাকা
বাঘমামা হাওয়া খায়
হাতে হাতপাখা।
নিজে থেকে লেখা আরও দুটি পঙক্তি:
তালপাতার পাখাখানি ঘোরায় বারবার,
শীতল বাতাসে জুড়ায় প্রাণটা যে তার।
তাল গাছেতে ঝুলছে দ্যাখো
বাবুই পাখির বাসা
শিল্পী পাখি বানায় বাসা
স্বপ্ন আশা
আপন ঠোঁটে গড়া এ ঘর
ভীষণ শক্ত খাসা
বাসা মানেই আপন লোকের
স্নেহ ভালোবাসা।
নিজে থেকে লেখা আরও দুটি পঙক্তি:
ঝড়-বৃষ্টিতেও দোলে বাসা পড়ে না তো ছিঁড়ে,
সন্ধ্যা হলেই ছানাগুলো মায়ের কোলে ফেরে।
৬। ধারণা-চিত্র ও গাছের উপকারিতা
পাঠ্যবইয়ের ছকে 'কাগজ' এবং 'বনৌষধ' দেওয়া রয়েছে। বাকি ছয়টি খালি ঘরে কি বসবে, তা দেওয়া হলো ছবিটির মধ্যে:
(খ) ওপরের ধারণা-চিত্রটি অবলম্বনে গাছ থেকে আমরা কীভাবে উপকৃত হই সে-সম্পর্কে লেখো।
উত্তর: গাছ আমাদের পরম বন্ধু। প্রতিদিনের জীবনে আমরা গাছের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। গাছ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন গ্যাস দেয় এবং বাতাসের দূষণ দূর করে।
খাবারের জন্য গাছ থেকে আমরা নানা রকমের ফলমূল ও শাকসবজি পাই। আমাদের লেখাপড়ার কাগজ এবং অসুখ সারানোর মূল্যবান বনৌষধও গাছ থেকেই আসে।
গাছ ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র তৈরির কাঠ, ক্লান্ত পথিকের বিশ্রামের ছায়া দেয়। এছাড়াও পশু-পাখির নিরাপদ আশ্রয় গাছ প্রদান করে।
ভাষা-অধ্যয়ন ও ব্যাকরণের সমাধান
- প্ + আ + ত্ + আ = পাতা
- ম্ + আ + থ্ + আ — মাথা
- প্ + আ + খ্ + আ - পাখা
- ব্ + আ + স্ + আ | বাসা
- ই + চ্ + ছ্ + আ : ইচ্ছা
- থত্থর = থ্ + অ + ত্ + থ্ + অ + র
- সারাদিন - স্ + আ + র্ + আ + দ্ + ই + ন
- পৃথিবী - প্ + ঋ + থ্ + ই + ব্ + ঈ
- মনটি - ম্ + অ + ন্ + ট্ + ই
- ধসা: সাধ
- ঘমে — মেঘ
- বীথিপৃ - পৃথিবী
- শআকা - আকাশ
- রপত্ততাপা: পাতা-পত্তর
- তাল + আ = তালা: বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় দরজায় ভালো করে তালা দিতে হয়।
- তাল + ই = তালি — মঞ্চে সুন্দর গান শুনে সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।
- তাল + উ = তালু - গরম খাবার তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে তার মুখের তালু পুড়ে গেছে।
- চিনি (প্রথম অর্থ — মিষ্টি জাতীয় খাদ্যবস্তু): দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি পায়েস খেতে খুব সুস্বাদু।
চিনি (দ্বিতীয় অর্থ — পরিচয় থাকা বা জানা): আমাদের গ্রামের সবগুলো রাস্তা আমি খুব ভালো করে চিনি। - দিন (প্রথম অর্থ — দিবাভাগ বা চব্বিশ ঘণ্টা সময়): বৃষ্টির পর আজ একটি ঝলমলে সুন্দর দিন দেখা দিয়েছে।
দিন (দ্বিতীয় অর্থ — দেওয়ার অনুরোধ): আমাকে পড়ার জন্য আপনার বাংলা বইটি একটু দিন। - পান (প্রথম অর্থ — এক প্রকার লতানো গাছের পাতা): আসামের সমাজে তামুল ও পান দিয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো হয়।
পান (দ্বিতীয় অর্থ — তরল কিছু খাওয়া): সুস্থ থাকার জন্য আমাদের প্রতিদিন পরিষ্কার জল পান করা প্রয়োজন।
- তাল + নবমী = তালনবমী: ভাদ্র মাসের শুক্লানবমী তিথি
- তাল + চোঁচ = তালচোঁচ — তালগাছের আঁশ বা ছাল (এছাড়া এক ধরনের ছোটো পাখিকেও তালচোঁচ বলা হয়)
- তাল + ভঙ্গ = তালভঙ্গ - গানের ছন্দ বা তাল কেটে যাওয়া
জ্ঞান-সম্প্রসারণ ও প্রকল্পের কাজ
- যে অঞ্চলে গাছপালা বেশি থাকে সেখানে নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়।
- অসংখ্য পশু-পাখি ও জীবজন্তুর নিরাপদ আশ্রয় হলো গাছ।
- গাছ চারপাশের বাতাস শীতল রাখে এবং দূষিত বায়ু শোধন করে অক্সিজেন গ্যাস দেয়।
১১। (খ) ছবিটি দেখে তোমার মনে কী ভাব জেগেছে বলো? ওপরের ব্যানারে উল্লিখিত কারণগুলো ছাড়াও আর কী কী কারণে গাছ লাগানো উচিত বলে তুমি মনে করো?

উত্তর: ছবিটি দেখে মনে হচ্ছে ছোটোবেলা থেকেই আমাদের প্রত্যেকের নিজের হাতে গাছ লাগানো এবং তার যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যানারে থাকা কারণগুলো ছাড়াও আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ফল ও সবজির জন্য গাছ লাগানো দরকার। এছাড়া জীবনদায়ী ওষুধ তৈরি, জ্বালানি ও আসবাবপত্রের কাঠ পাওয়ার জন্যও প্রচুর গাছ লাগানো প্রয়োজন।
- প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে নিয়ম করে চারার গোড়ায় পরিমাণমতো জল দিতে হবে।
- গরু-ছাগল যাতে চারাটি খেয়ে বা মাড়িয়ে নষ্ট করতে না পারে। সেজন্য চারপাশে বাঁশের বেড়া দিতে হবে।
- চারাগাছটির গোড়ার মাটি মাঝে মাঝে আলগা করে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জৈব সার দিতে হবে।
১. রোদ, ঝড় আর বৃষ্টির মধ্যে এক জায়গায় সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে তোমার কি কষ্ট হয়?
২. পাখিরা যখন তোমার ডালে বসে কিচিরমিচির করে গান গায়। তখন তোমার কেমন লাগে?
৩. তালগাছের মতো তোমারও কি কখনো ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে?
৪. কোন ঋতুতে নতুন পাতা ও ফুলে সেজে উঠতে তোমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে?
৫. কীভাবে মাটির নিচ থেকে জল টেনে আমাদের জন্য এত মিষ্টি ফল তৈরি করো?
১৩। গাছ হাঁটাচলা করছে কিংবা হাতি-ঘোড়া বা তোমার পছন্দের কোনো প্রাণী ডানা মেলে আকাশে উড়ছে, এমন একটি ছবি আঁকো। উত্তর: তোমরা নিজেদের ড্রয়িং খাতায় পেনসিল ও রঙ পেনসিল ব্যবহার করে মেঘের রাজ্যে ডানা মেলে উড়ে চলা একটি সুন্দর ঘোড়া বা হাঁটতে থাকা গাছের ছবি আঁকবে।
পাঠের অতিরিক্ত প্রশ্ন উত্তর (সহায়ক অংশ)
১। 'তালগাছ' কবিতাটির কবি কে এবং এটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে? উত্তর: 'তালগাছ' কবিতাটির কবি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিতাটি তাঁর লেখা বিখ্যাত 'শিশু ভোলানাথ' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
২। তালগাছটি কাকে নিজের মা বলে মনে করে? উত্তর: তালগাছটি মাটিকে নিজের মা বলে মনে করে।
৩। কখন তালগাছের মন আবার পৃথিবীর কোণে ফিরে আসে? উত্তর: বাতাস যখন নেমে যায় এবং পাতা কাঁপা থেমে যায়। তখন তালগাছের মন আবার মাটির টানে পৃথিবীর কোণে ফিরে আসে।
পরের পাঠ: পাঠ ২ একটি ফুটো কলসি প্রশ্নোত্তর
Class 4 Bangla Chapter 1 'তালগাছ' কবিতায় প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও মায়ের টানের কথা খুব সহজ ছন্দে ফুটে উঠেছে। বর্ণ বিশ্লেষণ এবং সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দগুলো খাতায় লিখে বারবার চেষ্টা করলে পরীক্ষার প্রস্তুতি আরও সহজ হবে।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন