সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পঞ্চম শ্রেণি পরিবেশ পাঠ ৭ অসমের সংস্কৃতি প্রশ্ন ও উত্তর | Class 5 Environment Chapter 7 in Bengali

আমরা প্রতিদিন যে ভাষায় কথা বলি, যে ধরনের খাবার খাই, যে পোশাক পরিধান করি এবং যে উৎসব পালন করি—এইসব কিছু মিলিয়েই আমাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আমাদের আসাম রাজ্যে বিভিন্ন জাতি, উপজাতি এবং ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বাস করেন। "Class 5-এর পরিবেশ বিষয়ের Chapter 7" "অসমের সংস্কৃতি" পাঠে আমরা আমাদের রাজ্যের এই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবো।

পাঠ- ৭ 'অসমের সংস্কৃতি' : সারমর্ম সহজ ভাষায়

একটি জাতির সংস্কৃতির পরিচয় তাদের জীবনযাপন, ভাষা, সাজপোশাক, খাদ্যাভ্যাস এবং উৎসব-পার্বণের মধ্য দিয়ে পাওয়া যায়। আমাদের আসাম রাজ্যে বিভিন্ন জাতির মানুষ বাস করেন; যেমন—অসমীয়া, বাঙালি, মিসিং, বড়ো, কার্বি, ডিমাসা, রাভা, তিওয়া এবং চা জনগোষ্ঠীর মানুষ।

এখানকার মানুষের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যে মেখলা চাদর, রিহা, দখনা ইত্যাদি অন্যতম। এছাড়া জোনবিরি, ঢোলবিরি, গলপাতা, গামখারু ইত্যাদি গয়না খুবই বিখ্যাত। অসমীয়া সংস্কৃতিকে সুন্দর ও শক্তিশালী করে তুলতে মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব এবং মাধবদেব অনেক অবদান রেখে গেছেন। শংকরদেবের তৈরি করা নামঘর, বরগীত, ভাওনা এবং সত্রীয় নৃত্য আসামের অমূল্য সম্পদ।

আসামের মানুষ বিহু, খেড়াই পূজা, আলি আই লৃগাং, করম পূজার মতো আনন্দময় উৎসব পালন করেন। এছাড়াও শিবসাগরের রংঘর, কারেংঘর, কামাখ্যা মন্দির, হাজোর পোয়া মক্কা এবং ধুবড়ির গুরুদ্বারের মতো প্রাচীন কীর্তিচিহ্নগুলো আমাদের আসাম রাজ্যের মিলন ও ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

পাঠ ৭ "অসমের সংস্কৃতি" প্রশ্ন উত্তর:

১। উত্তর লেখো—

(ক) অসমিয়া সংস্কৃতিতে মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের যেকোনো দুটো অবদানের বিষয়ে লেখো।

উত্তর: মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেবের দুটি অবদান হলো:
(i) তিনি সমাজে একতা ও ভক্তি আনার জন্য নামঘর ও সত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
(ii) মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করে অসমের সব মানুষকে একসাথে মিলিয়েছিলেন এবং সমাজে একতা এনেছিলেন।

(খ) গলায় পরে সে রকম চারপ্রকাররের অসমিয়া অলংকারের নাম লেখো।

উত্তর: গলায় পরা চার প্রকারের ঐতিহ্যবাহী অসমীয়া অলংকারের নাম হলো—জোনবিরি, ঢোলবিরি, গলপতা এবং সাতসরি।

(গ) তিন ধরনের নৃত্যের নাম এবং সেগুলোর সঙ্গে জড়িত তিন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের নাম লেখো।

উত্তর: অসমের তিন ধরনের নৃত্য এবং সেগুলোর সঙ্গে জড়িত বাদ্যযন্ত্রের নাম হলো—
(i) বিহু নৃত্য: ঢোল, পেঁপা, গগনা, টকা, সুতলি ও তাল (করতাল)।
(ii) সত্রীয়া নৃত্য: খোল এবং তাল বা করতাল।
(iii) ভোরতাল নৃত্য: ভোরতাল (এটি এক বিশেষ ধরনের বড় করতাল)।

(ঘ) চালের গুঁড়ো থেকে প্রস্তুত হয় এমন চার প্রকার খাদ্যবস্তুর নাম লেখো।

উত্তর: চালের গুঁড়ো থেকে প্রস্তুত হয় এমন চার প্রকার খাদ্যবস্তুর নাম হলো— তিল পিঠা, চুঙা পিঠা, চিতই পিঠা এবং ভাপা পিঠা।

(ঙ) শিবসাগর জেলার প্রাচীন কীর্তিচিহ্ন দুটোর নাম লেখো।

উত্তর: শিবসাগর জেলার দুইটি প্রাচীন কীর্তিচিহ্নের নাম হলো— রংঘর (Rang Ghar) এবং কারেংঘর (Kareng Ghar)।

(চ) অসমের দুটি মন্দির, দৌল ও সত্রের নাম লেখো।

উত্তর: দুটি মন্দির: কামাখ্যা মন্দির এবং হয়গ্রীব-মাধব মন্দির。
দুটি দৌল: শিবদৌল এবং জয়দৌল।
দুটি সত্র: আউনিআটি সত্র এবং কমলাবাড়ি সত্র।

২। শূন্যস্থান পূরণ করো—

শূন্যস্থান প্রশ্ন উত্তর
(ক) বৈশাখে ____ পালন করা হয়। বহাগ বিহু
(বা রঙালি বিহু)
(খ) খেরাই পূজা ___ দের পালিত উৎসব। বোড়ো
(গ) বিহু ___ জাতীয় উৎসব। অসমের
(ঘ) মিসিংরা ____ পালন করে। আলি-আই-লৃগাং
(ঙ) করম পূজা ___ রা পালন করে। চাহ জনগোষ্ঠী
(বা আদিবাসী)

৩। অসমিয়া সংস্কৃতিতে মহাপুরুষ শঙ্করদেবের অবদানের বিষয়ে দশটি বাক্য লেখো।

উত্তর: মহাপুরুষ শংকরদেবের বিষয়ে নিচে দশটি বাক্য দেওয়া হলো -

(i) তিনি অসমীয়া সংস্কৃতিকে একটি শক্তিশালী ও নিজস্ব রূপ দিয়েছিলেন।
(ii) তিনি বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করে অসমের সব মানুষকে একতার বাঁধনে বেঁধেছিলেন।
(iii) তিনি 'কীর্তন' ও 'গীত-পদ'-এর মতো অনেক মূল্যবান বই ও ধর্মগ্রন্থ রচনা করেন।
(iv) তিনি অসমীয়া সমাজে ভক্তিমূলক গান ও সংস্কৃতির চর্চা শুরু করেছিলেন।
(v) তিনি সাধারণ মানুষের জন্য 'ভাওনা-সভা' এবং ধর্ম আলোচনার পথ তৈরি করেন।
(vi) তাঁর তৈরি করা 'নামঘর' হলো অসমীয়া সমাজ ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র।
(vii) নাটক ও ভাওনা হওয়ার কারণে নামঘরকে অসমের ‘জাতীয় নাট্যশালা’ বলা হয়।
(viii) তিনি গান ও নাটকের জন্য 'খোল', 'তাল' ও 'করতাল'-এর মতো বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন।
(ix) তাঁর তৈরি করা ‘সত্রীয়া নৃত্য’ আজ সারা ভারতে একটি প্রধান ধ্রুপদি বা শাস্ত্রীয় নৃত্য হিসেবে সম্মান পেয়েছে।
(x) তিনি ও তাঁর প্রধান শিষ্য মাধবদেব মিলে অসমীয়া সংস্কৃতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

৪। সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো—

(ক) বিহু:

বিহু উৎসবটি মূলত কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। এটি আসামের জাতীয় উৎসব। বিহু বছরে তিনবার পালন করা হয়। সেগুলি হলো বৈশাখ মাসে বহাগ বিহু বা রঙ্গালি বিহু, কার্তিক মাসে কাতি বিহু এবং মাঘ মাসে মাঘ বিহু বা ভোগালি বিহু। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আসামের সবাই এই বিহু উৎসবগুলো পালন করেন।

(খ) পুতুলনাচ:

এটি হলো আসামের একটি অতি প্রাচীন এবং মজার লোকনাট্য শিল্প। এখানে মঞ্চের পিছনে লুকিয়ে একজন মানুষ কালো সুতা বেঁধে আঙুলের ইশারায় পুতুলগুলোকে নাচান। গ্রামের মেলা বা যেকোনো উৎসবে ছোট-বড় সবাই এই পুতুল নাচ দেখে খুবই আনন্দ পান।

(গ) অসমিয়া ভাষা:

আসাম রাজ্যের প্রধান ভাষা হলো অসমীয়া। যেকোনো ভাষার যেমন দুটি রূপ থাকে—একটি মুখের ভাষা বা কথিত রূপ এবং অন্যটি লেখার ভাষা বা লিখিত রূপ। ঠিক সেইভাবে অনেক আগে যখন মানুষ লিখতে জানত না, তখন অসমীয়া ভাষার নানা লোকগীত, বিহু নাম, রূপকথা, ধাঁধা ইত্যাদি মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। পরে ধীরে ধীরে এই ভাষাটি সুন্দর লিখিত রূপ পায় এবং এতে অনেক বইপত্র ও সাহিত্য রচিত হয়।

(ঘ) সত্রীয়া নৃত্য:

মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব সত্রিয়া নৃত্যকলার সৃষ্টি করেছিলেন। এই নৃত্যে খোল, তাল ও বাঁশির মতো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এখানে শিল্পীরা বিশেষ ধরনের পোশাক এবং অলংকার পড়েন। বর্তমানে সত্রিয়া নৃত্য ভারতবর্ষের অন্যতম প্রধান ধ্রুপদী নৃত্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

(ঙ) উৎসব-পার্বণ:

প্রতিটি জাতি এবং জনগোষ্ঠীর আলাদা আলাদা উৎসব-পার্বণ রয়েছে। আমাদের অসমে বিহু, দুর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিন ছাড়াও বিভিন্ন জনজাতির নিজস্ব উৎসব রয়েছে। যেমন—বোড়োদের খেরাই পূজা, মিসিংদের আলি-আই-লিগাং, ডিমাসাদের বুসু এবং চা জনগোষ্ঠীর করম পূজা ইত্যাদি। এইসব উৎসবগুলোর বেশিরভাগই কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত।

৫। 'ক' অংশের সঙ্গে 'খ' অংশ মেলাও—

‘ক’ অংশ (স্থানের নাম) ‘খ’ অংশ (সঠিক মিল)
(ক) তেজপুর অগ্নিগড়
(খ) কামরূপ পোয়ামক্কা
(গ) গোয়ালপাড়া সূর্য পাহাড়
(ঘ) ধুবড়ি তেগবাহাদুরের গুরুদ্বার
(ঙ) কাছাড় ভুবন পাহাড়ের মন্দির

৬। একটি শরাই এর ছবি আঁকো।

উত্তর: তোমরা খাতায় পেন্সিল ও স্কেলের সাহায্যে প্রথমে নিচের ত্রিভুজাকার পায়াটির ছবি আঁকবে। তারপর উপরে একটি চ্যাপ্টা বাটির মতো অংশ এঁকে তার উপর গম্বুজের মতো ঢাকনা ও চূড়া বসিয়ে দেবে। এরপর একটি সুন্দর শরাইয়ের ছবি হয়ে যাবে এবং তাতে তোমরা হালকা হলুদ বা সোনালী রং করে দেবে।

💡 শিক্ষকের টিপস (মনে রাখবে): তোমরা পরীক্ষার সময় প্রায়ই অসমের বিভিন্ন জাতি-জনগোষ্ঠীর উৎসবগুলোর নাম একটার সাথে অন্যটা মিলিয়ে ভুল করে ফেলো। মনে রাখবে, বড়োদের প্রধান উৎসব হলো 'বৈশাগু', মিচিংদের 'আলি-আই-লৃগাং' এবং কার্বিদের 'রংকের'। এগুলো খাতায় আলাদা তালিকা তৈরি করে পড়বে, তাহলে সহজে মনে থাকবে।

তোমাদের জন্য আরও কিছু পাঠ:

আগের পাঠ: পাঠ ৬ অসমের প্রাকৃতিক সম্পদ

পরের পাঠ: পাঠ ৮ দুর্যোগ ও আমরা প্রশ্নোত্তর

আমাদের আসাম রাজ্য বিভিন্ন জাতি-জনগোষ্ঠীর মিলনের এক সুন্দর প্রতীক। তাই আমাদের সবার উচিত নিজেদের সংস্কৃতির পাশাপাশি অন্য সব জাতির ভাষা এবং উৎসবকে সমানভাবে শ্রদ্ধা করা। আজকের পাঠ থেকে তোমাদের কোন উৎসবটি সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে? নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারো!

শেয়ার করুন:

মন্তব্যসমূহ