আমাদের চারপাশে নানা রকমের উপাদান রয়েছে; যেমন—গাছপালা, পশুপাখি, জল, মাটি, বাতাস এবং সূর্যের আলো ইত্যাদি। এই সবকিছু মিলেমিশে আমাদের সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
পরিবেশে যাদের প্রাণ আছে, তাদেরকে আমরা জীব বলি; আর যাদের প্রাণ নেই, তাদেরকে আমরা জড় বা অজৈবিক উপাদান বলি। Class 5 Environment Chapter 2 "জীব ও পরিবেশ"-এর মাধ্যমে আমরা খুব সহজ ভাষায় জানব কীভাবে জীব ও পরিবেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল।
জীব ও পরিবেশ পাঠ ২: মূলভাব সহজ ভাষায়
উদ্ভিদ, অর্থাৎ সবুজ গাছপালা নিজের খাদ্য নিজে প্রস্তুত করতে পারে বলে তাদেরকে উৎপাদক বলা হয়। অন্যদিকে প্রাণীরা নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারে না, তারা অন্যের উপর নির্ভরশীল; তাই প্রাণীদেরকে উপভোক্তা বলা হয়। এছাড়াও মাটিতে ছোট ছোট অণুজীব, যেমন—ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক রয়েছে; যেগুলো মরা গাছপালা ও প্রাণীদেহ পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়, যাদেরকে আমরা বিয়োজক বলি।
পরিবেশে সবুজ উদ্ভিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে খাবারের মাধ্যমে শক্তির যে ধারাবাহিক শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তাকে খাদ্যশৃঙ্খল বলা হয়। আর অনেকগুলো খাদ্যশৃঙ্খল একসাথে মিলেমিশে খাদ্যজাল সৃষ্টি হয়। নির্দিষ্ট কোনো একটি জায়গায় সব জীব এবং জড় পদার্থ মিলে যে সুন্দর পরিবেশ গড়ে ওঠে, তাকে পরিস্থিতিতন্ত্র বলা হয়; যেমন—পুকুর।
পাঠের সব প্রশ্ন ও উত্তর
১। উত্তর লেখো —
(ক) পরিবেশে জৈবিক ও অজৈবিক উপাদানগুলো কী কী?
উত্তর: পরিবেশের জৈবিক উপাদানের কয়েকটি নাম হলো মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা ও অণুজীব ইত্যাদি। পরিবেশের অজৈবিক উপাদানের কয়েকটি নাম হলো মাটি, জল, বায়ু এবং সূর্যের আলো ইত্যাদি।
(খ) উদ্ভিদকে কেন উৎপাদক বলা হয়?
উত্তর: সবুজ উদ্ভিদ কারও সাহায্য ছাড়াই সূর্যের আলো, জল ও বাতাসের সাহায্য নিয়ে নিজের খাবার নিজে তৈরি করে। সেজন্যই উদ্ভিদকে উৎপাদক বলা হয়।
(গ) উপভোক্তা কত প্রকার ও কী কী?
উত্তর: উপভোক্তা প্রধানত তিন প্রকার। সেগুলি হলো—
• প্রাথমিক উপভোক্তা: ছাগল, গরু, হরিণ, ঘাসফড়িং (এরা সরাসরি ঘাস বা উদ্ভিদজাতীয় খাবার খায়)।
• গৌণ বা দ্বিতীয় শ্রেণির উপভোক্তা: ব্যাঙ, শিয়াল, বেড়াল, ছোট মাছ (এরা প্রাথমিক উপভোক্তাদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে)।
• তৃতীয় শ্রেণির উপভোক্তা: সাপ, বক, ঈগল, মাছরাঙা (এরা দ্বিতীয় শ্রেণির প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে)।
(ঘ) বিয়োজক আমাদের কীভাবে সাহায্য করে?
উত্তর: বিয়োজকরা মাটিতে থাকা মৃত গাছপালা ও প্রাণীর দেহ পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে সাহায্য করে। এর ফলে পরিবেশ সবসময় পরিষ্কার থাকে এবং মাটির উর্বরতা ও পুষ্টি বাড়ে। এভাবে বিয়োজকরা আমাদের সাহায্য করে থাকে।
(ঙ) তিনটি পরিস্থিতিতন্ত্রের নাম লেখো।
উত্তর: তিনটি পরিস্থিতিতন্ত্রের নাম হলো—পুকুর পরিস্থিতিতন্ত্র, মরুভূমির পরিস্থিতিতন্ত্র এবং তৃণভূমির পরিস্থিতিতন্ত্র।
২। শূন্যস্থান পূরণ করো —
| শূন্যস্থান প্রশ্ন | উত্তর |
|---|---|
| (ক) শামুক হলো ________ শ্রেণির উপভোক্তা। | প্রথম শ্রেণির |
| (খ) একের চেয়ে অধিক ________ মিলে খাদ্যজাল সৃষ্টি হয়। | খাদ্যশৃঙ্খল |
| (গ) ঈগল পাখি হলো ________ শ্রেণির উপভোক্তা। | তৃতীয় |
| (ঘ) খাদ্যজালে একের চেয়ে ________ খাদ্যশৃঙ্খল থাকে। | বেশি |
৩। শুদ্ধ উত্তর বেছে বের করো —
(ক) খাদ্যশৃঙ্খলের শুরুতে সবসময় উদ্ভিদ / প্রাণী / অণুজীব থাকে।
উত্তর: উদ্ভিদ।
(খ) বিয়োজক / উৎপাদক / উপভোক্তা খাদ্য প্রস্তুত করে।
উত্তর: উৎপাদক।
(গ) উৎপাদক / বিয়োজক / উপভোক্তা মৃতদেহ পচে গলে যেতে সাহায্য করে।
উত্তর: বিয়োজক।
৪। খাদ্যশৃঙ্খল কী? উদাহরণসহ বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: পরিবেশের মধ্যে একটি জীব অন্য জীবকে খাবার হিসেবে ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে। সবুজ উদ্ভিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে খাবারের মাধ্যমে যে শক্তির ধারাবাহিক একটি শৃঙ্খলা তৈরি হয়, তাকে খাদ্যশৃঙ্খল বলে। এর মাধ্যমে সূর্যের শক্তিটি গাছ থেকে ধাপে ধাপে একের পর এক প্রাণীর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
উদাহরণ: ঘাস → ঘাসফড়িং → ব্যাঙ → সাপ।
এখানে সবুজ ঘাস খাবার তৈরি করে, ঘাসফড়িং সেই ঘাস খায়, ব্যাঙ ফড়িংকে খায় এবং সাপ ব্যাঙকে খেয়ে বেঁচে থাকে। এভাবে একটি খাদ্যশৃঙ্খল তৈরি হয়েছে।
৫। পুকুর একটি পরিস্থিতিতন্ত্র কি না, তা যুক্তিসহকারে বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: হ্যাঁ, পুকুর একটা পরিস্থিতিতন্ত্র। কোনো জায়গায় জীব ও জড় উপাদান মিলেমিশে থাকলে সেটিকে পরিস্থিতিতন্ত্র বলে। আর পুকুরে এই সবগুলো উপাদান রয়েছে।
পুকুরে জীব উপাদান হিসেবে রয়েছে শ্যাওলা ও জলজ উদ্ভিদ (উৎপাদক), ছোট-বড় মাছ ও পোকা (উপভোক্তা) এবং ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক (বিয়োজক)। আর জড় উপাদান হিসেবে রয়েছে জল, মাটি, দ্রবীভূত গ্যাস ও সূর্যালোক। এই জড় এবং জীব উপাদানগুলো একসাথে মিলেমিশে থাকে, সেজন্যই পুকুর একটি পরিস্থিতিতন্ত্র।
৬। সালোকসংশ্লেষণ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: যে প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদ নিজের সবুজ পাতার মধ্যে সূর্যের আলোর সাহায্যে মাটি থেকে শোষণ করা জল এবং বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস ব্যবহার করে নিজের খাবার তৈরি করে, সেটিকে সালোকসংশ্লেষণ বলা হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাবার তৈরি করার সময় গাছ বাতাসে অক্সিজেন ছাড়ে, যা দিয়ে আমরা শ্বাস নিই।
৭। পার্থক্য লেখো —
(ক) উৎপাদক ও বিয়োজকের মধ্যে পার্থক্য:
| উৎপাদক | বিয়োজক |
|---|---|
| ১. এরা সূর্যের আলোর সাহায্যে নিজের খাবার নিজেই তৈরি করতে পারে। | ১. এরা নিজের খাবার তৈরি করতে পারে না, মৃত গাছপালা ও মরা পশুপাখি পচিয়ে খাবার পায়। |
| ২. এরা খাবার তৈরির জন্য সূর্যের আলোর ওপর নির্ভর করে। | ২. এরা শক্তির জন্য পচা জৈব জিনিসের ওপর নির্ভর করে। |
| ৩. এরা পরিবেশের জড় উপাদান ব্যবহার করে খাবার তৈরি করে। | ৩. এরা মরা জিনিস পচিয়ে মাটিকে আবার উর্বর ও পুষ্টিকর করে তোলে। |
| ৪. যেমন—সবুজ গাছপালা, শ্যাওলা ও কচুরিপানা। | ৪. যেমন—বিভিন্ন ছোট পোকা, ব্যাকটেরিয়া এবং ব্যাঙের ছাতা (ছত্রাক)। |
(খ) তৃণভোজী ও মাংসাশী প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য:
| তৃণভোজী প্রাণী | মাংসাশী প্রাণী |
|---|---|
| ১. এরা কেবল ঘাস, লতাপাতা ও ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকে। | ১. এরা অন্য পশুপাখির মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে। |
| ২. গাছপালা চিবিয়ে খাওয়ার জন্য এদের দাঁত চ্যাপ্টা হয়। | ২. মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য এদের দাঁত অনেক ধারালো ও সুচালো হয়। |
| ৩. এরা বনের শান্ত প্রকৃতির প্রাণী হয়। | ৩. এরা শিকারি ও হিংস্র প্রকৃতির প্রাণী হয়। |
| ৪. যেমন—গরু, ছাগল, হরিণ ও খরগোশ। | ৪. যেমন—বাঘ, সিংহ, শিয়াল ও চিল। |
(গ) খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজালের মধ্যে পার্থক্য:
| খাদ্যশৃঙ্খল | খাদ্যজাল |
|---|---|
| ১. পরিস্থিতিতন্ত্রে উদ্ভিদ থেকে প্রাণীতে খাবার পৌঁছানোর সরল শৃঙ্খল বা লাইনকে খাদ্যশৃঙ্খল বলে। | ১. পরিস্থিতিতন্ত্রে অনেকগুলো শৃঙ্খল যখন একসাথে মিলে জটিল জাল তৈরি করে, তখন তাকে খাদ্যজাল বলে। |
| ২. এটি পরিস্থিতিতন্ত্রের একটি মাত্র সরল শৃঙ্খলকে দেখায়। | ২. এটি পরিস্থিতিতন্ত্রের অনেকগুলো শৃঙ্খলের একত্রিত রূপ বা জালকে দেখায়। |
| ৩. এই শৃঙ্খলে কোনো একটি জীব হারিয়ে গেলে পুরো শৃঙ্খলটি ভেঙে পড়ে। | ৩. এই জালে বিকল্প খাবার থাকায় পরিস্থিতিতন্ত্রের ভারসাম্য সহজে নষ্ট হয় না। |
| ৪. উদাহরণ: ঘাস → ফড়িং → ব্যাঙ → সাপ (একটি মাত্র সরল শৃঙ্খল)। | ৪. উদাহরণ: একটি পরিস্থিতিতন্ত্রে একই ফড়িং বা ব্যাঙকে একাধিক পাখি বা প্রাণী খাওয়া (জালের মতো সম্পর্ক)। |
৮। পরিস্থিতিতন্ত্রে প্রথম শ্রেণির উপভোক্তা না থাকলে কী হবে?
উত্তর: পরিস্থিতিতন্ত্রে প্রথম শ্রেণির উপভোক্তারা হলেন ছাগল, হরিণ ও ঘাসফড়িঙের মতো তৃণভোজী প্রাণীরা। এরা সরাসরি ঘাস ও লতাপাতা খায়। কিন্তু এরা যদি না থাকে, তাহলে লতাপাতা খাওয়ার কেউ থাকবে না; এতে উদ্ভিদের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে যাবে।
এছাড়াও মাংসাশী প্রাণীরা তৃণভোজী প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই প্রথম শ্রেণির উপভোক্তারা না থাকলে মাংসাশী প্রাণীরা না খেয়ে মারা যাবে। এতে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে।
৯। খাদ্যজাল কেন সৃষ্টি হয়?
উত্তর: প্রকৃতির মধ্যে কোনো প্রাণী শুধু একটি নির্দিষ্ট খাবারের উপর নির্ভরশীল নয়। ঘাস বা শস্যদানা শুধু ফড়িং খায় না, ইঁদুর ও খরগোশও খায়। আবার সেই ইঁদুরকে কখনো সাপ খায়, আবার কখনো চিল, পেঁচা বা বেড়াল ধরে খায়। এভাবে একটি প্রাণী যেমন নানা রকমের খাবার খায়, তেমনি একটি প্রাণীকে আবার একাধিক প্রাণী খায় বলে অনেকগুলো খাদ্যশৃঙ্খল মিলে খাদ্যজাল সৃষ্টি হয়।
১০। মাটিতে মৃত জীবগুলো অনেক দিন ধরে পড়ে থাকলে কেন পচে গলে যায়?
উত্তর: মাটিতে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের মতো ছোট ছোট অণুজীবরা থাকে, যাদেরকে আমরা বিয়োজক বলি। মাটিতে যখন কোনো গাছ বা মৃত প্রাণীর দেহ অনেক দিন ধরে পড়ে থাকে, তখন বিয়োজকরা সেগুলোর উপর কাজ শুরু করে।
এরা মৃত জীবের দেহকে ধীরে ধীরে পচিয়ে গলিয়ে দেয় এবং মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে পরিবেশের পুষ্টি উপাদান ফিরিয়ে আনে। এই কারণে মৃত জীবগুলো অনেক দিন ধরে থাকলে মাটিতে পচে গলে যায়।
শেষের কথা
আমাদের পরিবেশকে সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা উচিত। পঞ্চম শ্রেণির পাঠ ২ "জীব ও পরিবেশ"-এর কোনো প্রশ্ন-উত্তর বুঝতে অসুবিধা হলে নিচে কমেন্ট বক্সে জানাবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন